সাক্ষী কিছু সোডিয়াম আলোর ল্যাম্পপোস্ট...
- Sabbir Ahmed Shibli

- Jan 13, 2018
- 3 min read
Updated: Jan 14, 2018

রিসাতের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দিন আজকে। না ভুল বললাম, শুধু রিসাতের নয়, আনিকারও। ক্যাম্পাসের লাল ইটের দালানগুলো ছেড়ে আজ বিদায় নেবে রিসাত, আনিকার মতন কিছু তরুণ-তরুণী। সামনে তাঁদের নতুন এক জীবন। ধরতে গেলে সে জীবন হবে নিঃসঙ্গ এক জীবন। মেয়েদের ক্ষেত্রে হয়তো নয়। কারন অতি শীঘ্রই বিয়ের পিড়িতে বসে যাবে অনেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরুবার আগেই অনেকে বসেও গেছে। ছেলেদের জীবনটা হবে ঐ নিঃসঙ্গতার সাথী। একটা চাকুরী খুঁজতে খুঁজতে স্যান্ডেলের তলি ক্ষয়ে যাবে কারো কারো। ফর্মাল ড্রেস পড়ে সিভি নিয়ে লোকালে ঝুলে ঝুলে কিংবা সকাল-সন্ধ্যা অফিস করে দিন যাবে। তারপর হয়তো বাবা মায়ের মনে হবে এবার ছেলের বিয়ে দেয়া দরকার। জীবনযাত্রা আলাদা হলেও প্রত্যেকের ক্ষেত্রে একটা জিনিস প্রায় একইরকম হবে। খুব ক্লান্ত বিকেলে লোকাল বাসের জানালার পাশে বসে রিসাত হয়তো ভাববে ক্যাম্পাস জীবনটার কথা। টুকরো সুখ গুলো, এক চিলতে ভালোবাসা, ক্যান্টিনে আড্ডা, ভালোবাসার মানুষটিকে দেখা- যাকে বলা হয়ে ওঠেনি মনের কথাটি। আনিকারও হয়তো স্বামী-সংসার সামলাতে গিয়ে কোন এক জোছনা রাতে মনে পড়ে যাবে সেই দিনগুলোর কথা। তারও কত স্মৃতি, আর ভালোবাসার মানুষ! আজ সবই অতীত। যাক গিয়ে, সেটা ভবিষ্যৎ। এখন চারদিকে রঙ ছোড়াছুড়ি চলছে। কেক কাটা হবে। গতানুগতিক র্যাগ ডে এর প্রোগ্রাম। কেও কেও খুব উপভোগ করছে। কারো কারো মন বিষাদে ভরা। জুনিওররা বেশ আনন্দ নিয়ে বড় ভাইদের অটোগ্রাফ নিচ্ছে। তাদের টি-শার্ট দেয়া হয়েছে। দুপুরে লাঞ্চও করানো হবে। একটা ছোটখাট কালচারাল প্রোগ্রামের আয়োজনও করা হয়েছে বিকেলে। রিসাত ক্যাম্পাসের কোনের একটা কদম গাছের নিচে পাতা বেঞ্চিতে বসে আছে। ডিপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের ভেতর থেকে কোন একটা ডিস্কো গানের মিউসিক ভেসে আসছে। সেদিকে মন নেই তার। এদিকে আনিকা মাঝখানে কোত্থেকে যেন ফ্রেশ হয়ে এসেছে। শারী পড়েছে সে। "কি রিসাত একা বসে আছো যে? ফ্রেশও হওনি দেখছি?" রিসাত আনিকার ডাকে ওর দিকে ফিরে তাকাল। কি অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে! আগে কখনও আনিকাকে শারী পড়া দেখেনি সে। চোখে কাজলও দিয়েছে মেয়েটা। কি এক অজানা কারনে রিসাত-আনিকা কেউ কাওকে তুই করে বলে না। অবশ্য আনিকা অসম্ভব দূরত্ব বজায় রাখা মেয়ে। ক্যাম্পাসের আড্ডা, গ্রুপ স্টাডি কোনটাতেই পাওয়া যায়না তাকে। "আসলে ভাল লাগছিল না। ইয়ে মানে আনিকা তোমাকে একটা কথা বলি?" আনিকা রিসাতের পাশেই বসল। "বল শুনি।" "ইয়ে মানে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।" কোথাটা বলে কেমন জানি লজ্জায় কুঁকড়ে গেল রিসাত। সেই সাথে ভয়ও ভর করেছে তার উপর। আনিকা কীভাবে নিলো কথাটা কে জানে। শেষমেশ ভার্সিটির শেষ দিন না জানি কোন কেলেঙ্কারি হয়ে যায়! "হা হা। ফ্লার্ট করছ?" নাহ অন্যভাবে নেয়নি সে। হাফ ছেড়ে বাচল রিসাত। "আচ্ছা রিসাত যাও ফ্রেশ হয়ে এস। আমি ভেতরে যাই। প্রোগ্রাম শুরু হল বলে।" আনিকা উঠে যাবার পরও রিসাত আরও কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর উঠে মামার দোকানে গিয়ে সিগারেট ধরালো একটা। -- সব প্রোগ্রাম শেষ হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বিদায়ের পালা। চারদিকে কান্না-কাটির রোল পড়েছে। মেয়েগুলো একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না! ছেলেদের চোখেও জল। আস্তে আস্তে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে সবাই। পরশু থেকে ফাইনাল এক্সাম। ভার্সিটি জীবনের শেষ পরীক্ষা। "কি ব্যাপার আনিকা দাড়িয়ে আছো যে?" "রিকশা খুঁজছি। আসলে সত্যি বলতে একা যেতে একটু ভয় করছে। বাসা থেকে লোক আসার কথা ছিল কাজে আটকে গেছে।" "আমি এগিয়ে দেব? এখানে রিকশা পাবেনা। চল সামনের মোর পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া যাক।" রিসাত আর আনিকা পাশাপাশি হাঁটছে। সোডিয়াম আলোর ল্যাম্পপোস্টগুলো কেমন যেন একটা ভূতুরে পরিবেশ তৈরি করেছে। "তারপর ক্যারিয়ার নিয়ে কি চিন্তা ভাবনা?" আনিকা নীরবতা ভাঙল। "জানিনা। যেতে থাকুক জীবন যেভাবে যায়।" আবার নিস্তব্ধতা দুজনের মাঝে। দুজনের মনেই কথা ঘুরছে। অনেক অনেক কথা। সেই ক্যাম্পাসের প্রথম দেখার পর থেকে আজ অব্দি শত সহস্র কথা জমে গেছে। হয়তো আর বলা হবেনা সেসব কথা। "আনিকা!" - এবার নীরবতা ভাঙল রিসাত। "হুম।" "আমি কি তোমার হাতটা ধরতে পারি? একবারের জন্য?" রিসাত এক দমে বলে ফেলল কথাটা। আবার সেই শঙ্কা, আনিকা কি ভাবলো তাকে! আনিকা নীরব। হঠাৎ করে রিসাত অনুভব করল একটা হাত তার হাতকে স্পর্শ করেছে। সে হাতের কাঁচের চুরিগুলো কেমন যেন বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বার বার। শিহরিত রিসাত মুহূর্তে চোখ বন্ধ করে ফেলল। আনিকা তার বাহু জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে হাঁটছে! মৃদু আলো আনিকার চোখে ছলছলে জলের উপস্থিতি প্রকাশ করে দিচ্ছে। "রিসাত!" "বল।" "তুমি যে বড্ড দেরি করে ফেলেছ।" রিসাত নিশ্চুপ। সে জানে সে অনেক দেরি করে ফেলছে। ক্যাম্পাসে প্রথম দেখেই যে মেয়েটাকে ভালবেসে ফেলেছিল আজ শেষ বেলায় হাত ধরে অনুভব করছে ঐ হাতটা ধরে রাখতে পারবেনা সে। সোডিয়াম আলোয় হাঁটছে দুজন তরুণ তরুণী। ক্রমেই পথকে পেছনে ফেলে গন্তব্যের দিকে তাঁদের পথচলা। আর হয়তো বেশী সময় পাশাপাশি থাকবেনা দুজন। সময় যে বড্ড নিষ্ঠুর!
(আমি লিখালিখি পারিনা। তার উপর কথোপকথনমূলক লিখাতে সম্পূর্ণ আনাড়ি। তারপরও একটা রমরমে ভালোবাসার গল্প লিখার চেষ্টা করেছি। ইচ্ছে আছে এই গল্প থেকে একটা শর্ট ফিল্ম বানাবো।)
ছবিটা তুলেছিলাম ২০১৪ এর কোন এক শীতের বিকেলে। দুটো হাতই ছেলের, মেয়ে মডেল পাইনি। আরাফাত আর নাইম, দুই বন্ধুর হাত।




Comments